কক্স সাহেবের বাজারে একদিন

প্রকাশিত: ৮:৫২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০২০

রোজ পারভীনঃ

সন্ধ্যার পর সাদা ফসফরাসের সমুদ্রের অন্য এক আবেদন। সমুদ্র যেমন সীমাহীন, আমরাও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেতেছিলাম সীমাহীন আনন্দে। এরপর কক্সবাজার সমুদ্রে যাওয়া হয়েছে অনেক বার। কিন্তু প্রথম সাগর দেখার স্মৃতি মনে জ্বলজ্বলে।

সেই প্রথম সমুদ্র দেখা, নোনা জলে পা ভেজানো, এর বিশালত্বে মগ্ন হওয়া। বুদ্ধদেব বসুর দুটি লাইন মনে পড়েছিল কলাতলী পেরোতেই।

“একবার নিজেকে দাও না সমুদ্রের কাছে,

তারপর দ্যাখো সে তোমাকে নিয়ে কী করে।

মনে হচ্ছিল ঘোরের ভেতরে আছি। ঘড়ি সেখানে ব্যর্থ। হুঁশ ছিল না কোনো।

সকাল ১০টায় সাগরে নেমে উঠেছিলাম বিকাল ৪টারও পর। এরপর হোটেলে ফিরে নাকে-মুখে কিছু দেয়া। আবার সূর্যাস্ত দেখতে সৈকতে ফেরা। দিশাহারা মনটা বলছলি, “যাবো না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে…।’’

সন্ধ্যার পর সাদা ফসফরাসের সমুদ্রের অন্য এক আবেদন। সমুদ্র যেমন সীমাহীন, আমরাও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেতেছিলাম সীমাহীন আনন্দে। এরপর কক্সবাজার যাওয়া হয়েছে অনেক বার। কিন্তু প্রথম সাগর দেখার স্মৃতি মনে জ্বলজ্বলে।

কক্সবাজারের বিবর্তন দেখা হয়েছে চাক্ষুস। সাগর পাড়ের স্নিগ্ধ জনপদ জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা হয়েছে ধীরে ধীরে। তবে মানতেই হবে এ পরিবর্তন ছিল পরিকল্পনাহীন। এটি আদ্যোপান্তই পরিবেশ রক্ষার ভাবনা বহির্ভূত।

মধ্যযুগে আরাকান শাসিত এ জনপদের নাম ছিল ‘পালঙ্কী’। পরে এর নাম হয় ‘পানোয়া’, যার অর্থ হলুদ ফুল। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণি কি আর ফুল বোঝে? ‘নৃশংস বণিকবৃত্তিতে’ তারা সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসে এখানে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিভূ ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স এখানে বাজার স্থাপন করেন। আগের নামগুলো বিলীন হয়। অনবদ্য এ সাগর পার পরিচিত হয়ে ওঠে কক্সবাজার নামে।

উপনিবেশ তার জুলুমের দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রাখে। এর ভিন্ন কিছু নয় নামকরণ। হলুদ ফুলের জনপদের ইতিহাস ছাপিয়ে মানুষের মুখে মুখে স্থায়ী হয় কক্সবাজার। তাই হারানো হলুদ ফুলের জন্য চাপা কান্না সইতেই হয়।

চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো বেল্টের ভাষাই ভিন্ন। কক্সবাজারে রিকশাওয়ালা মামাকে ‘থামেন’ বা ‘রাখেন’ বললেও চালাতেই থাকেন। বলতে হয় ‘থুইয়ো’। তবেই রাখবেন মামা। সমুদ্রকে স্থানীয়রা ডাকেন ‘দইজ্জা’ নামে। দরিয়ার অপভ্রংশ রূপ এটি। উত্তাল সাগরের কক্সবাজার ভার্সন হলো ‘দইজ্জ্যা গরম’!

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ প্রথম সমুদ্র দেখেন এই কক্সবাজারে এসে। এর ঋণ তাই শোধযোগ্য নয়। বার্মিজ মার্কেটে তারা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সংস্পর্শে আসেন। এটিও দেশের আরেক সৌন্দর্য।

কক্সবাজারের একটু দূরেই রামু। প্রায় দুই হাজার বছর পূর্ব বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন এটি। সিদ্ধার্থের ধ্যান মগ্নতায় মোহিত হতে হয় এখানে এসে। মাত্র কয়েক বছর আগেই কালিমালিপ্ত হয়েছিল এই রামু। হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আগুনে পুড়েছিল এখানে। এখন সেনাবাহিনী কর্তৃক পুনর্নির্মিত ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের বৌদ্ধমূর্তি দেখে ভুলে যেতে চেয়েছিলাম সে পোড়া অতীত।

শুধু নির্বাণই কামনা করেছিলাম মানবজাতির। ভেদহীন এক মানবসমাজই তো আমাদের আমৃত্যু কামনা।

অনেক নেতিবাচকতা আছে কক্সবাজারের। কেন দূষণে কালো এর তট? বর্জ্য ফেলার জায়গা থাকা সত্ত্বেও কেন সৈকতটি এমন প্লাস্টিকে ঠাসা? এটাই কি ব-দ্বীপ জননীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য? কেন প্রতি বছর মানুষ সাগরে ভেসে যায় এখনো? প্রতিটি উন্নয়নে কেন পরিবেশ ভাবনা উপেক্ষিত হয়। এমন প্রশ্ন তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে।

রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রোহিঙ্গা গণহত্যার ছাপ এখনও স্পষ্ট কক্সবাজারজুড়ে। একাত্তরের উদ্বাস্তু বাংলাদেশ কোনো শরণার্থী ফেরাতে পারে না। কিন্তু সেটি নিশ্চয়ই একটি নির্দিষ্ট সময়জুড়ে। চিরকাল তো মানুষ শরণার্থী পরিচয়ে বাঁচতে পারে না। কক্সবাজারের পাহাড়, বন, প্রকৃতি, পরিবেশেরও একটি সহ্য ক্ষমতা আছে। এসব প্রশ্নও কক্সবাজার ঘুরে আসা মানুষের মনে জাগা সঙ্গত।

আরও নান্দনিক কক্সবাজার চাই। সমুদ্র সার্ফিংয়ে সাফল্য পাওয়া নারীদের প্রতি শুভ কামনা। বিচ ফুটবল জনপ্রিয় দীর্ঘতম এ সমুদ্র সৈকতে।

অত্যাধুনিক সিনেপ্লেক্স স্থাপন, মঞ্চ নাটকের জন্য সুব্যবস্থা হোক এখানে। দেখতে চাই পুরো মাত্রার এক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স। এক মুহূর্তেও আনন্দ ধারা যেন না থামে এই গর্বের বালুকাবেলায়।




error: কপি রাইট আইনে সর্বস্বত সংক্ষিত
%d bloggers like this: