দেড় দশকে কক্সবাজারে সাড়ে ৩ হাজার পাহাড় কেটে সাবাড়!

প্রকাশিত: ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১

জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : দেড় দশকে কক্সবাজারে সাড়ে ৩ হাজার পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে- বলে তথ্য দিয়েছে পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য নেচার বাংলাদেশ। তবে পাহাড় কাটার তথ্য দূরে থাক, কক্সবাজারে কী সংখ্যক পাহাড় আছে, সে তথ্যও জানা নেই জেলা প্রশাসনের। বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরও জানে না, কক্সবাজারে এখন পর্যন্ত কতটি পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য নেচার বাংলাদেশ কক্সবাজারের পাহাড় কাটা নিয়ে বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই সংগঠনটির দাবি, ২০০৫ সালে কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনে প্রায় ৮ হাজার পাহাড় ছিল। দেড় দশকের ব্যবধানে সাড়ে ৩ হাজারের অধিক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে পাহাড় কাটার প্রতিযোগিতা।

তবে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের কাছে কতটি পাহাড় কাটা হয়েছে এমন কোনো তথ্য নেই। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশাপাশি উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সরকারি-বেসকারি প্রতিষ্ঠান বেশকিছু পাহাড় কেটেছে বলে স্বীকার করেছে বন বিভাগের কর্মকর্তারা। একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।

সেভ দ্য নেচার বাংলাদেশের এর চেয়ারম্যান আ.ন.ম. মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, ‘এখনো রাতদিন রামুর ধোয়া পালং, খুনি পালংসহ কয়েকটি এলাকায় দেড়শো থেকে দুইশো শতাধিক ট্রাকে করে পাহাড় কেটে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে। একইভাবে চকরিয়া ও কক্সবাজার সদরের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতিযোগিতা করে পাহাড় কাটা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সাবাড় করে ফেলা পাহাড়গুলোর ঘনফুট নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। দেখা গেছে, পাহাড়ের সামান্য অংশ বিশেষ সাবাড় করলে ১০ থেকে ২০ লাখ ঘনফুট হয়ে যায়। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ না থাকলে এভাবে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা সম্ভব নয়।’

সরজমিন দেখা গেছে, কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল, ঝিলংঝা, পিএমখালী, ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, ঈদগাঁও, কক্সবাজার পৌরসভার ফাতার ঘোনা, কলাতলী এলাকায় অসংখ্য পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে। এসব এলাকাগুলোতে এখনো পাহাড় কাটা চলছে।

কক্সবাজারের শত শত মানুষ নির্বিচারে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ধুম পড়েছে কক্সবাজারে। এতে করে একদিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড়ে বসবাসরত প্রাণীগুলো হারাচ্ছে নিরাপদ আবাসস্থল।

পাহাড় কাটা প্রতিরোধে এ পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ বিষয়ে সবসময় তাদের অবস্থান কঠোর ছিল, এখনো আছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে পাহাড় কাটার সঙ্গে নাছির প্রকাশ নুনু, জাহাঙ্গীর কাশেম, মনিউল হক, কায়সার, নুরুল আলম বহদ্দার, রফিক, মনিরুল, সাহাব উদ্দীন, শাহাজান, ওবায়দুল, ওবায়দুল করিম, শরিফ উদ্দীন, আবদুল্লাহ, মোবাশ্বের, আবছার, দিদার, এহসানসহ অনেকেই জড়িত। তাদের প্রায় সবার নামে মামলা করেছে বন বিভাগ।

পাহাড়-খেকো হিসেবে আলোচিত নাছির উদ্দীন বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, ‘আগে আমার নামে পাহাড় কাটার দায়ে তিনটি মামলা হয়েছিল। তবে এখন আমি আর পাহাড় কাটার সাথে জড়িত নই। আমি পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ারের ভাই।’ তবে পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়া কিছু ড্রাম ট্রাকের মালিক হিসেবে নাছিরের নাম উঠে আসছে- এ বিষয়ে নাছির উদ্দীন বলেন, ‘ড্রাম ট্রাকগুলো আমি ভাড়া দিয়ে থাকি।’

পাহাড় কেটে মাটি বিক্রিতে অভিযুক্ত মনিউল হকের দাবি, পাহাড় কাটার সঙ্গে তিনি জড়িত নয়। তবে তিনি ফসলি জমির মাটি ইটভাড়ায় বিক্রি করেন বলে স্বীকার করেন।

অন্যদিকে রামু উপজেলার অবস্থা আরও ভয়াবহ। সরেজমিন দেখা গেছে, রামুর খুনিয়াপালং, ফতেখাঁরকুল, রশিদ নগর, কাউয়ারখোপ, মিঠাছড়ি, রাজারকুল, কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, জোয়ারিয়ানালা, ভারুয়াখালী, চাকমারকুল ইউনিয়নেও শত শত পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে।

রামুতে পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে মিঠাছড়ির ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুছ ভূট্টো, তার ভাই নুরুল আজিম, স্থানীয় শফিকুর রহমান, ছৈয়দ নুর, সাদ্দাম হোসেনসহ অন্তত ৫০ জন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের প্রায় সবার নামে বন বিভাগের মামলা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউনুছ ভূট্টোর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলে তিনি সাড়া দেননি। তবে এ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার দায়ে মামলার পাশাপাশি বিশাল অংকের জরিমানা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী, ডুলাহাজরা, ফাঁসিয়াখালীর উচিতার বিল, নয়াপাড়া, মুসলিমনগর ইউনিয়নে শতাধিক পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে। পেকুয়া উপজেলার, শিলখালী, বারবাকিয়া এলাকায়ও শতাধিক পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া, হোয়ানক, ছোট মহেশখালী শাপলাপুর ইউনিয়নে ১০ থেকে ১৫ পয়েন্টে ২ শতাধিক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।

এ ছাড়াও উখিয়া উপজেলার, পালংখালী, থাইংখালী, জালিয়া পালং, রাজার পালং ইউনিয়নেও কাটা হয়েছে শতাধিক পাহাড়। এসব উপজেলায়ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও ড্রাম ট্রাকের মালিকের নেতৃত্ব পাহাড় কাটা চলছে। সেখানে পাহাড় কাটার দায়ে জরিমানা ও মামলা হচ্ছে। তারপরও পাহাড় কাটা থামানো যাচ্ছে না।

বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ পেপার’কেকে বলেন, গত ৩ বছরে শুধু উত্তর বন বিভাগের প্রায় ৫ শতাধিক পাহাড় কর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে সদরের খুরুশখুল ইউনিয়ন, পিএমখালী ও ইসলামপুরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। তবে বন বিভাগ পাহাড় কাটা রোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাংলাদেশ পেপার’কেকে বলেন, ‘বন বিভাগের সহযোগিতায় কক্সবাজার জুড়ে নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে। শুধু কক্সবাজার শহরেই উত্তরণ গৃহায়ন সমিতি একাই ৯৩ একর পাহাড় সাবাড় করেছে। ওই ৯৩ একরে শখানেক ছোট বড় পাহাড় ছিল। যেখানে বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, হরিণসহ ৩৬ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর দেখা মিলতো। এখন নিরাপদ আবাসন হারিয়ে এসব প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির ও উত্তরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পাহাড় কাটা হচ্ছে- এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দুইজনই বাংলাদেশ পেপার’কে জানান, বন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রতিদিন পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গত ১৫ বছরে সাড়ে ৩ হাজার পাহাড় কাটার বিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বন বিভাগ হেক্টর হিসেব করে থাকে। তাই কতগুলো পাহাড় ছিল, কতগুলো পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে বলা মুশকিল।’

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বন বিভাগের লোকবল সংকট, নানান বাধা-বিপত্তি আছে। অবৈধ ড্রাম ট্রাকগুলোর চলাচল বন্ধ করা গেলে পাহাড় কাটা বন্ধ করা সম্ভব বলে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আমিন আল পারভেজ বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় কী পরিমাণ পাহাড় ছিল, কী পরিমাণ সাবাড় হয়েছে- এ ধরনের কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। হয়তো পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে এ তথ্য থাকতে পারে। তবে সময় নিয়ে মৌজা ভিত্তিক হিসেব করলে পাহাড়ের সংখ্যা বের করা যেতে পারে।’

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, ‘কী সংখ্যক পাহাড় কাটা হয়েছে সে পরিবেশ অধিদপ্তর এক মুহুর্তের জন্য বসে নাই। অনেক পাহাড়-খেকোর বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে।’ অবৈধ ড্রাম ট্রাকের কারণে পাহাড় কাটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অবৈধ ট্রাকের বিষয়ে অবগত করা হলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) রাকিবুল ইসলাম বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, ‘শুনেছি, কক্সবাজারে হাজার হাজার অবৈধ ড্রাম ট্রাক আছে। অবৈধ ট্রাকগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’




error: কপি রাইট আইনে সর্বস্বত সংক্ষিত