যেভাবে র‌্যাবের জালে ‘প্রতারক’ শাহেদ

প্রকাশিত: ১২:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০

রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের ৯ দিন পর র‌্যাবের জালে পাকড়াও হলেন প্রতারক মো. শাহেদ। এই ৯ দিন ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, কক্সবাজার ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করেছেন। সর্বশেষ সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টাকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে র‌্যাব জানিয়েছে।

বুধবার ভোরে দেবহাটা উপজেলার শাখরা কোমরপুর সীমান্ত এলাকার ইছামতি নদী থেকে তাকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে র‌্যাব জানায়, কলপ দিয়ে চুল কালো করে, গোঁফ ছেটে নিজের চেহারা পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন শাহেদ। বোরকা পরে তিনি পালাতে চেয়েছিলেন।

ভোরে আটকের পর শাহেদকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। দুপুরে তাকে নিয়ে উত্তরার একটি বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। পরে সদরদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন র‌্যাব’র মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

বিকালে ঢাকা মেডিকেলে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর শাহেদকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আজ বৃহস্পতিবার আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে তদন্ত সূত্র জানিয়েছে।

র‌্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করেন শাহেদ। ছদ্মবেশে হেঁটে, ট্রাকে করে অথবা গাড়িতে করে তিনি একস্থান থেকে আরেক স্থানে যান। গ্রেপ্তার এড়াতে চেহারা পরিবর্তন করার জন্য তিনি তার চুলে কলপ দেন ও গোঁফ ছোট করে ফেলেন। বোরকাও পরিধান করেছিলেন।

যেভাবে গ্রেপ্তার
র‌্যাব জানিয়েছে, জনৈক বাচ্চু দালালসহ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে সীমান্ত নদী ইছামতি দিয়ে নৌকায় ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন শাহেদ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব’র গোয়েন্দা দল ওই এলাকায় নজরদারি করছিল। তথ্য পেয়ে তাকে সেখান থেকে আটক করা হয়। আটকের পর গণমাধ্যমে আসা ছবিতে দেখা যায় একটি শার্ট ও প্যান্ট পরা শাহেদের পায়ে নারীদের ব্যবহৃত জুতার আদলে জুতা পরা। তার শার্টের ওপর কালো কোর্টের মতো দেখতে কিছু একটা পরা। তার গলায় নতুন একটি গামছা ঝুলানো। কোমরে জং ধরা একটি রিভলবার। ওই রিভলবারে ৩ রাউন্ড গুলি ছিল বলে র‌্যাব জানিয়েছে।

সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, শাহেদ স্বাভাবিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার দুইহাত হ্যান্ডকাফ লাগানো ছিল। পরনে ছিল নীল শার্ট এবং জিন্স প্যান্ট। গ্রেপ্তারের সময় তার সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে র‌্যাব। এজন্য তার ঘাড়ে কাদা লেগে ছিল।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রেপ্তার করে নেয়ার সময় র‌্যাব কর্মকর্তার সঙ্গে কিছু একটা বলছেন শাহেদ। এছাড়া গ্রেপ্তারের পর শাহেদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষজনের জটলা এবং তাকে মারধর করতে উদ্যত হওয়ার দৃশ্য দেখা যায় অন্য একটি ভিডিওতে।

র‌্যাব জানিয়েছে, দেশ ত্যাগের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি সাতক্ষীরার দেবহাটায় এক দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই দালাল ইছামতি নদীতে আগে থেকেই একটি ডিঙ্গি নৌকা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। ভোরের আধো আলোতে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য ওপারের দালালও ঠিক করছিলেন। তার কাছে থাকা একটি কালো লাগেজে ব্যবহারের জিনিসপত্র ছিল।

গ্রেপ্তারের পর শাহেদকে নিয়ে যাওয়া হয় সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে। সেখানে তাৎক্ষণিক এক প্রেসব্রিফিংয়ে র‌্যাব’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার জানান, সাতক্ষীরা সীমান্তের কয়েকজন দালাল মানুষ পাচার ও চোরাকারবারে জড়িত। এদের মধ্যে কয়েকজনকে তারা চিহ্নিত করেছেন। তাদের মাধ্যমেই শাহেদ করিম ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিল।

গ্রেপ্তার করার পর র‌্যাব’র এয়ার উইং এর একটি হেলিকপ্টারে করে সকাল ৮টার দিকে তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় র‌্যাব সদর দপ্তরে। পরে সেখানে তাকে সাময়িক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরা এলাকার একটি ভবনে। ওই ভবনে শাহেদের একটি কার্যালয় ছিল। সেখান থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মূল্যমানের জালনোট উদ্ধার করা হয়।

অভিযান শেষ হওয়ার পর র‌্যাব সদর দপ্তরে বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, করোনা চিকিৎসা নিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতারণার ঘটনা ঘটে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উঠে আসে রিজেন্ট হাসপাতালের নাম। গত ৬ জুলাই উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে ভ্রামমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সেই হাসপাতালে কয়েকটি অনিয়ম পাওয়া যায়। যেমন, ভুয়া লাইসেন্স, অর্থের বিনিময়ে করোনা পরীক্ষা এবং করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট দেয়া।

এসব অপরাধে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল এবং তার আরেকটি শাখা মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করে র‌্যাব’র ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় র‌্যাব বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় ১৭ জনকে আসামি করা হয়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে শাহেদের বিভিন্ন অপকর্ম উঠে আসে।

তিনি জানান, ঘটনার পর থেকে শাহেদ পলাতক ছিল। তাকে ধরতে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালানো হয়। পরে অব্যাহত গোয়েন্দা নজরদারির প্রেক্ষিতে বুধবার ভোর ৫টার দিকে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে তাকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।

তিনি আরও জানান, প্রতারক শাহেদ কখনও নিজেকে সেনা কর্মকর্তা, কখনও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বলে পরিচয় দিতো। সুকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে নানা ধরণের প্রতারণার কাজ করে যাচ্ছিলো। কিন্তু, সে প্রকৃত পক্ষে অর্থলিপ্সু, চতুর ও ধুরন্ধর প্রকৃতির ব্যক্তি। গণমাধ্যমে উঠে এসেছে তার নামে প্রায় ৫০টি মামলা দায়ের আছে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার চুক্তি থাকলেও তারা পরীক্ষার নাম করে রোগীদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে নিয়েছে। এছাড়াও ওই হাসপাতালের মানহীন আইসিইউতে রোগী আটকে তারা টাকা আদায় করতো। প্রায় ১০ হাজার রোগী রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা পরীক্ষা করেছে। তার মধ্যে ৬ হাজারই ভুয়া রিপোর্ট।

র‌্যাব’র মহাপরিচালক জানান, একদিকে রোগীদের কাছ থেকে তারা টাকা নিয়েছে, অন্যদিকে তারা আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে করোনা পরীক্ষার বিল আদায়ের জন্য ভাউচার জমা দিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু, তাদের বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসার কথা ছিল। ঘটনার পর থেকেই শাহেদ পলাতক ছিল। মামলা হওয়ার পরপরই শাহেদ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আত্মগোপনের চেষ্টা চালায়। ঢাকা থেকে সে কুমিল্লা, কক্সবাজার ও সাতক্ষীরায় গেছে। গত সাত থেকে আটদিনের মধ্যে শাহেদ একাধিকবার ঢাকায়ও এসেছে।

কখনো নিজস্ব গাড়িতে যাতায়াত করেছে, কখনো ভাড়া গাড়ি, কখনো ট্রাকে, আবার কখনো পায়ে হেঁটেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করেছে।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর র‌্যাব’র জিজ্ঞাসাবাদে কী বলেছে জানতে চাইলে তিনি জানান, সে র‌্যাব’র জিজ্ঞাসাবাদে অনেক কথা বলেছে। তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না।

হ্যান্ডকাফ হাতে থাকা অবস্থায় তার কোমর থেকে কেন পিস্তল উদ্ধার করলো না র‌্যাব, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, তিনি এ বিষয়টি অবগত না।

২০০৯ সাল থেকে শাহেদ প্রতারণা করে যাচ্ছে এবং তার নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে প্রায় ৫০টি মামলা হয়েছে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কেন গ্রেপ্তার করতে পারলো না- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, র‌্যাব’র কাছে অভিযোগ আসার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তার ইন্ধনদাতা ও আশ্রয়দাতাদের গ্রেপ্তার করা হবে কি-না সাংবাদিকরা জানতে চাইলে র‌্যাব ডিজি জানান, তদন্তে যদি শাহেদের অপকর্মে কারও ইন্ধন থাকে তাহলে অবশ্যই আমরা তাকে গ্রেপ্তার করবো।

এদিকে শাহেদকে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার পর র‌্যাব’র একটি টিম তাকে নিয়ে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাড়িতে যায়। সেখানে থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার জাল টাকা উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, শাহেদের কাছে যারা তার কাছে টাকা পেতো তাদের তিনি জাল টাকা দিয়ে প্রতারণা করতো। এটাও তার একটি প্রতারণা।
এছাড়াও তিনি ‘ল’ না পড়েও ওই বাসায় ‘ল’ চেম্বার খুলেছেন। ভুয়া আইনি সহায়তা দিয়ে তিনি মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

বাড়িটির কেয়ারটেকার তারা মিয়া সাংবাদিকদের জানান, দুই মাস আগে বাড়ির চারতলার একটি ফ্ল্যাট ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন শাহেদ। বাড়ি ভাড়া নেয়ার আগে শাহেদের লোকজন ফ্ল্যাটটি দেখে যান এবং বাড়ির মালিক ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা করেন। চুক্তি অনুযায়ী মাসে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া নেন।

বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টায় শাহেদকে নিয়ে র‌্যাব তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। সেখানে শাহেদ স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো। সে হেঁটেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যায়।

বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন ঢামেক হাসপাতালের ক্যাম্প পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া।

উল্লেখ্য, করোনা পরীক্ষায় ভুয়া সনদ দেয়ার অভিযোগ আসায় রিজেন্ট হাসপাতালে গত ৬ ও ৭ জুলাই অভিযান চালায় র‌্যাব। তখন হাসপাতালটির নানা দুর্নীতি প্রকাশ পাওয়ার পর জানা যায়, হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকলেও সেটিকে কোভিড চিকিৎসার জন্য নির্বাচিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অভিযানের পর লাপাত্তা হয়ে যায় শাহেদ। এরপর থেকে তার নানা প্রতারণার তথ্য আসতে শুরু করে।




error: কপি রাইট আইনে সর্বস্বত সংক্ষিত