গোলাপ গ্রামে বসন্ত-ভালোবাসার ছোঁয়া

প্রকাশিত: ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১

প্রদীপ দাসঃ  সাভারের বিরুলিয়া সেতু পর্যন্ত পৌঁছতেই শুক্রবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা বেজে যায়। সেখানকার দোকানপাটের সামনে দাঁড়াতেই দেখা যায়, মোটরসাইকেলের পেছনে বসা এক তরুণী। অনেকগুলো লাল গোলাপ তরুণীর হাতে। সেখানে দাঁড়ানো অবস্থায় আরও দুই মোটরসাইকেলের দেখা মিলল, যাদের পেছনে তরুণী বসা এবং তাদের হাতে ১০-১৫টি করে গোলাপের তোড়া।

স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে বাকি থাকলো না, বিরুলিয়া ইউনিয়নের গোলাপ চাষ করা গ্রামগুলো ঘুরে তরুণ-তরুণীরা ফিরছেন। এরপর বিরুলিয়া সেতু পার হয়ে যতই সামনে এগোতে থাকলাম, ততই এমন দৃশ্য আরও চোখে পড়তে থাকলো। এদিন পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেল, গোলাপ গ্রামগুলোয় ঢল নেমেছিল তরুণ-তরুণী, দম্পতি, মধ্যবয়সীসহ শিশু-কিশোরদের।

স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার প্রায় সবার ছুটি থাকে। তাই এদিন মানুষের ভিড় থাকে। শনিবারও ভিড় থাকে এখানে। রোববার থেকে ভিড় কমে যায়। তবে এবার শুক্র, শনির পর রোববার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বসন্তের প্রথম দিন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। অন্য শুক্রবারের তুলনায় এ শুক্রবার একটু ব্যতিক্রম, মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। শনিবারও ভিড় থাকবে, রোববার ভিড় আরও বেশি থাকবে। তাছাড়া এখন গোলাপের মৌসুম। ক্ষেতভরা গোলাপ দেখতে এ সময় প্রতি বছরই অনেক মানুষ আসে।

বিরুলিয়ার শ্যামপুর গ্রামে গোলাপ বাগান তুলনামূলক বেশি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি। পাশাপাশি মোটরসাইকেল রাখার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে পার্কিংয়ের। রাস্তার দুধারে বসেছে ফুলের দোকান। খাবারের দোকানেরও কোনো ঘাটতি নেই। গোলাপ ক্ষেতের আইল দর্শনার্থীদের পদচারণায় পরিপূর্ণ। খাবারের দোকান, ফুলের দোকান ও এগুলোর সামনের ফাঁকা জায়গাও দর্শনার্থীতে পূর্ণ। বিশেষ করে বিকেলবেলা দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল আশাতীত। কেবল তাই নয়, ক্ষেতের ধারে বা গাছের ছায়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে নিরিবিলি সময় পার করছেন আগতরা।

গোলাপ গ্রামগুলোয় যে কেবল তরুণ-তরুণীরাই ভিড় করছেন, তা নয়। অনেকেই তাদের পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন। শিশু থেকে মধ্যবসয়ী সবারই উপস্থিতি রয়েছে। কেবল তাই নয়, দুজন বিদেশিরও দেখা মিলল এই গোলাপ গ্রামে।

আগতদের সাজসজ্জায়ও গোলাপের আমেজ। অনেকেই গোলাপ, জিপসিসহ নানা ফুল দিয়ে বেল বানিয়ে মাথায় পরেছেন। অনেকে সদ্য গাছ থেকে তোলা গোলাপের তোড়া হাতে নিয়ে ঘুরছেন। গোলাপ গ্রামে এসেছেন অনেকেই লাল রঙের কাপড় পরে। তরুণদের পরনেও ছিল লালচে পাঞ্জাবি। সবমিলিয়ে লালে লালে যেন একাকার হয়ে উঠেছিল অঞ্চলটি।

গোলাপ গ্রাম সম্পর্কে ইউটিউবের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘সবসময় তো সময় পাওয়া যায় না। আজ শুক্রবার পরিবারের সঙ্গে যেন সময় ভালো কাটে, তাই এখানে আসা। গোলাপ গ্রাম সম্পর্কে আমরা ইউটিউবে জেনেছি। এখানে আসার আগে যেমন অনুভূতি ছিল বা রাস্তায় যে দুর্ভোগ ছিল, কিন্তু আসার পর তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগছে। প্রাকৃতিকভাবে গ্রামটি খুবই সুন্দর। অনেক ভালো সময় কেটেছে আমাদের।’

গোলাপ চাষি রমিজ উদ্দিন  বলেন, ‘আজ শুক্রবার, সেজন্য লোক একটু বেশি। অন্যান্যবার এত লোক হয় না। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ওই দিন আরও বেশি মানুষের উপস্থিতি হবে। আজ যা আইছে, ১৪ তারিখ আরও বেশি আসবে।’

গোলাপ গ্রামের আনন্দের জায়গা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কথার কথা, আপনি যেমন আসলেন। কোনো গোলাপ চাষিকে বললেন, ক্ষেত থেকে আমারে ১০টা ফুল দেন। কিংবা আপনি ক্ষেত থেকে কেটে হাতে করে নিয়ে গেলেন। মনে আনন্দ হইল যে, টাটকা ফুল। এই। মানুষজন ছুবিটবি তুলতাছে, ঘুরতাছে, মনের আনন্দ। এইহানে তো খাওয়ারও কিছু নাই, দাওয়াতেরও কিছু নাই, যা খাবেন তা টেকার ওপর দিয়া, যা করবেন টেকার ওপর দিয়া। আপনে খাইলেন না এক কাপ চা, খরচ হইল না। আপনে বাইক লইয়া আইছেন, চইলা গেলেন বা গোলাপ কিনলেন ২০০ টাকার, লাইয়া গেলেন। কিনলেন না, নিলেন না। এই। কেউ আপনারে জোরও করবো না, অত্যাচারও নাই। এভাবে চলতাছে সবার লগে।’

নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো ভেজাল নেই। এই দেহেন ঘুরতাছে এত এত লোক, কেউ কাউরে কিছু কয় না। আর যারা বিক্রি করতাছে, তারা শুধু কইবো মামা ফুল লাগবো না? নিলে নেন না নিলে নাই। এইটুকুই। পরিবেশ এক্কেরে নিরিবিলি। না হলে রাত ৮টা পর্যন্ত ঘুরবেন, কেউ কিছু বলবে না। আপনে পরিবার নিয়ে আসবেন ঘুরবেন, বইবেন, খাইবেন- কেউ কিছু বলবে না। একটা শব্দও করবে না।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমে গ্রামটি সম্পর্কে প্রচার হওয়ায় এখানে নিয়মিত পর্যটক আসে। রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘টিভিতে, পেপারে প্রচার হয়েছে এই জায়গাটা। এ কারণে সবাই ঘুরার লেইগা আহে। কিন্তু যে জিনিসটা দেইখা আহে, কিন্তু হেই জিনিসটা এইখানে আইসা পায় না। কারণ অনেক সময় ভরপুর গোলাপ ক্ষেত থেকে ছবি তুলে দিছে। দেখা গেছে, অনেক সুন্দর। আইয়া তো ওইরকম ভরপুর বাগান পাওয়া যায় না। গোলাপের মৌসুম আছে। বর্তমানে গোলাপের মৌসুম চলছে। ফেব্রুয়ারির পরে আসলেই দেখবেন অনেক ক্ষেতে কিছুই নাই। ছাইড়া দিছে ক্ষেত। ওইডার আর যত্ন নিবো না। ফুলের দাম কমবো, ২০০ বা দেড়শ টাকা বান্ডিল অইবো, অনেকেই ক্ষেত ছাইড়া দিবো। বিষ, পানি দিব না। নষ্ট অইয়া যাইবো। আবার রোজা রমজান মাস আইবো, ওইসময় ছাইটা, কাইটা নিড়ানি দিয়ে সার দিবে, ক্ষেত আবার সুন্দর হয়ে যাবে।’

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে গোলাপ চাষিরা বাগানের যত্ন করে। তাই এই সময় বাগানে প্রচুর গোলাপ থাকে, যা অন্য সময় থাকে না। ফলে ক্ষেতভরা গোলাপ দেখতেও এই সময় মানুষের উপস্থিতি বেশি থাকে বলেও জানান স্থানীয়রা।




error: কপি রাইট আইনে সর্বস্বত সংক্ষিত