একবিংশ শতাব্দীর এক অভিশাপের নাম “শিশু শ্রম”

প্রকাশিত: ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

বর্তমান বিশ্বে আধুনিকতার স্পর্শ যেন আকাশ চুম্বী । মাথার উপর দিয়ে যেমনি উড়ে যায় বিশাল হাওয়ায় জাহাজ তেমনি রাস্তায় চলে দামী বিলাস বহুল গাড়ি । প্রতিটা শহরের চোখ ধাঁধানো বিশাল বিশাল দালান গুলো  প্রমান করে আজ আমরা আধুনিকতার সর্বোচ্চ শিখরে কিন্ত তবুও একবিংশ শতাব্দীর এক অভিশাপের নাম “শিশু শ্রম” ।

এখনো ছোট বড় প্রতিটা শহরে দেখা মেলে শিশুদের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে । বয়সটা যখন পাঠ্য বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর, ঠিক সেই বয়সে আজো আমাদের দেশে শিশুরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে/চায়ের দোকানে/ গাড়ির গ্যারেজ সহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজ করে ।

                 গাড়ির গ্যারেজে কর্মরত শিশু শ্রমিক

ইউনেস্কোর তথ্য মতে, বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৩,৯ % ভাগ যা বিশ্বে র‌্যাংকিং-এ এর অবস্থান ১২৪ তম। এরপরেও বাংলাদেশে শিশুশ্রমের হার খুবই বেশি। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী এই শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭৪ লাখের বেশি। অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া শিশুশ্রম তাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

এই বয়সে শ্রমে নিযুক্ত করা একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় পড়াশোনা ও খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত শ্রমে নিযুক্ত এসব শিশু। বয়সের তুলনায় তাদের অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হয়, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর। শিশুরা যত ধরনের কাজ করছে, তার সবই যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা নয়। কিন্তু যেসব কাজ তাদের শৈশবের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে, সেগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের একটি শিশু প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৬৪ ঘণ্টা কাজ করে। এর বিনিময়ে সে দিনে দুই ডলারের কম উপার্জন করে(বরগেন ম্যাগাজিন)

বাংলাদেশ শিশুশ্রম সমীক্ষা-২০১৩ শীর্ষক একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় সাড়ে নয় লক্ষ ছেলে শিশু এবং সাড়ে সাত লক্ষ মেয়ে শিশু বিভিন্ন গার্মেন্টস এবং ফ্যাক্টরিতে নিযুক্ত রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৩ লক্ষ শিশু বিভিন্ন কারখানায় বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত রয়েছে। শিশুদের একটি বড় অংশ কৃষি খাতেও স্বনিযুক্ত হয়ে কাজ করে যেসব অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে। বৃহত্তরভাবে শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প

শ্রমিকদের অধিকারে স্পষ্ট শিশু শ্রমের ব্যাপারে  বলা আছে । ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১ মে শিকাগোর শ্রমিকদের রক্তদানকে।

তখন থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হতে থাকে ‘মে দিবস’। বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনকালীন সময়ে নারায়ণগঞ্জে প্রথম মে দিবস পালন শুরু হয়। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনকালে শোষণের বিরুদ্ধে এ দিবস পালন ছিল বেশ তাত্পর্যমণ্ডিত। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘মে দিবসকে’ সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেন।

শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ এবং কোন কারখানায় তাদের কে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে যোগ্যতা সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়। শিশু বলতে তার বয়স চৌদ্দ বছর সম্পন্ন হয়েছে এবং কিশোর বলতে ষোল বছর সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু সে ১৮ বছরের নিচে এমন ব্য্যক্তি কে বোঝায়। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে, কোন শিশু বার বছর সম্পন্ন করেছে এমন শিশু কে হালকা কাজে নিয়োজিত করা যাবে যেখানে শিশুটির শারীরিক স্বাস্থ্য এবং উন্নয়নে বা মানসিক বিকাশে কোন প্রকার ব্যাঘাত ঘটাবে না। এই ধরনের শিশুদের কাজের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে করে তাদের স্কুলের উপস্থিতির কোন সমস্যা না হয়। শ্রম আইনের অধীনে শিশুদের শ্রম চুক্তি তাদের পিতামাতা বা অভিভাবক দ্বারা করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে। কিশোর শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তাদের উপযুক্ততার সার্টিফিকেট নিবন্ধিত চিকিৎসক দ্বারা প্রদান করা বাধ্যতামূলক। এই ধরনের যোগ্যতা সার্টিফিকেট ইস্যু করার তারিখ হতে বার মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকে।

সূত্র- (শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ৩৪-৩৮ ও ৪৪, সংশোধিত ২০১৩)  

বিপজ্জনক কাজের জন্য নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর। ১৬ বছরের উপরে এবং ১৮ বছরের নিচে শ্রমিকদেরকে কোন প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি চালু অবস্থায় পরিষ্কারের জন্য, তেল প্রদানের জন্য বা তাকে সুবিন্যস্ত করার জন্য বা সেই যন্ত্রের চলমান অংশগুলোর মাঝে বা স্থির এবং চালু অংশের মাঝে কাজ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। কোন কিশোর এমন কোন যন্ত্রের কাজ করবে না যদি না সে উক্ত যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত বিপদ সম্পর্কে এবং এই ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবে অবগত থাকে অথবা সেই যন্ত্রতে কাজ করার ব্যাপারে সে যথেষ্ট প্রশিক্ষন গ্রহন করেছে বা সেই যন্ত্র সংক্রান্ত অভিজ্ঞ এবং পুরোপুরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির তত্তাবধানে কাজ করে। একজন কিশোর শ্রমিক কোন কারখানা বা খনিক্ষেত্রে দিনে ৫ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৩৩ অধিক কাজ করতে পারবে না এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দিনে ৭ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৫ ঘণ্টার অধিক কাজ করতে পারবে না। কোন কিশোর শ্রমিককে কোন প্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যা ৭টা হতে সকাল ৭টার মধ্যে কাজ করতে দেওয়া যাবে না। কোন কিশোর শ্রমিককে ভূগর্ভে বা পানির নিচে বা অন্য বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ২০১২ সালে সরকার শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ কাজের একটি তালিকা তৈরি করে, তবে এটি এখন অনুমোদিত হয়নি। এই তালিকাতে জাহাজ ভাঙ্গা, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরন, নির্মাণকাজ এবং মোটরকারখানাতে কাজ সহ ৩৬টি পেশার কথা বলা হয়েছে।

ইতিমধ্যে, একটি নতুন আইন অনুমোদন করা হয়েছে (শিশু আইন ২০১৩) যা শুধু শিশুদের কাজের জন্য আইনগত বয়স স্থির করে না বরং যদি কর্মসংস্থানে শিশু শোষিত (একটি শিশুর জীবন এবং উপার্জনকে জব্দ করার মাধ্যমে) হয় তাহলে কঠোর শাস্তিও নির্ধারণ করে যা হল দুই বছর কারাদণ্ড থেকে শুরু করে ৫০,০০০টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয়ই হয়ে থাকে। যদি কোন ব্যক্তি বিশেষ লাভ ভোগের জন্য কোন শিশুর কর্মসংস্থান করে বা অনৈতিক বিনোদনের জন্য কোন শিশুকে ব্যবহার করে তবে তাকে সেই দোষের পোষক হিসেবে ধরা হবে।

সূত্র- (শিশু আইন ২০১৩ এর ধারা ৮০, শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ৩৯-৪২, সংশোধিত ২০১৩) 

 

               শিশু শ্রমিকের চোখে স্বপ্ন পড়ালেখার

এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধন-২০১৩) আইনের, ১৬০ ধারায় শ্রমিকদের জন্য দুর্ঘটনাজনিত বীমা স্কিম চালু করার কথা বলা হয়েছে। শিশু শ্রম বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার পৃথক শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে শিশু শ্রম সম্পর্কিত ৫৯টি মামলা  শ্রম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

শ্রমিক বঞ্চনা ও শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে যৌক্তিক মজুরি, শ্রমঘণ্টা ও অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করতে হবে। শিশু শ্রম বন্ধে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে পালন করতে হবে ইতিবাচক ভূমিকা। তবেই দেশের শিশুরা ভবিষ্যতে মানবসম্পদ তথা জাতির প্রকৃত কর্ণধার হয়ে উঠবে।

 

লিখাঃ

দিলরুবা কানিজ ফাতিমা সাথী, সাবরিনা আকতার ও  তন্ময় বড়ুয়া 

আইন বিভাগ (৩৯ তম ব্যাচ)

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম ।




error: কপি রাইট আইনে সর্বস্বত সংক্ষিত
%d bloggers like this: