বাংলাদেশ, , মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

এবারের বড় বন্যার পেছনে চার কারণ

বাংলাদেশ পেপার ডেস্ক ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০১৯-০৭-২৭ ১২:৪৩:৪৬  

ডেস্ক নিউজঃ

১৯৯৮ সালের বন্যায় যমুনার বাহাদুরাবাদ (জামালপুর) পয়েন্টে প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ২ হাজার কিউমেক পানি প্রবাহ হতো। এবার পানি প্রবাহ ৭০ হাজার কিউমেক। ওই পয়েন্ট দিয়ে পানি নামতে না পারায় তা জামালপুরকে প্লাবিত করেছে।

পাশাপাশি উজানের জেলাগুলোকেও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেছে। ফলে উত্তরের বিভিন্ন জেলা আড়াই সপ্তাহ ধরে বন্যা কবলিত।

বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারে ব্রহ্মপুত্র পানি তুলনামূলক কম এসেছে। এরপরও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের চেয়েও ভয়াবহ। উত্তরের কোনো কোনো জেলা-উপজেলায় নিম্নাঞ্চল ছাপিয়ে বন্যার পানি শহরাঞ্চলেও ঢুকেছে। সবমিলে এবারের বন্যা ‘দীর্ঘমেয়াদি বন্যা’র চরিত্র ধারণ করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, বন্যার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যমুনায় ১৯৯৮ সালের মতো পানি কখনও আসেনি। ওই বছর বাহাদুরাবাদ পয়েন্ট দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ২ হাজার কিউমেক পানি প্রবাহ ছিল। এবার সেটা প্রায় ৭০ হাজার কিউমেক। আগের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ এলেও সেই পানির উচ্চতা বৃদ্ধির রেকর্ড ভেঙেছে। ফলে তা দুই তীরের মানুষকে ভাসিয়ে নিয়েছে।

পানি ও বন্যা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, কম পানি আসার পরও বড় বন্যা সৃষ্টির পেছনে মূলত চারটি কারণ আছে। এগুলো হচ্ছে- পলি জমাট হয়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, নদীর প্লাবন ভূমি ও জলাভূমি দখল বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অল্প সময়ে অধিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে বেশি পলিপ্রবাহ।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, উজান থেকে যে বৃষ্টির পানি বেশি এসেছে, তা নয়। ব্রহ্মপুত্রের পানি জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে দুটি চ্যানেলে ভাগ হয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু পলি পড়ে প্রধান চ্যানেল ধীরে ধীরে বাম দিকে সরে গেছে। অপর চ্যানেল দিয়ে পানি প্রবাহ হয় না বললেই চলে। ফলে প্রত্যাশিত পরিমাণে পানি নামতে না পারায় তা জমে যায়। এতে ওই পয়েন্টে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বাধিক উচ্চতায় উঠেছে পানির স্তর।

পানি প্রবাহের গতি কম হওয়ার ক্ষেত্রে বাহাদুরাবাদ একটি দৃষ্টান্ত মাত্র বলে উল্লেখ করেন এ গবেষক।

জাপানের নাগোয়্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৯৯ সালের এক স্টাডিতে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্রতে প্রতি বছর ৭২১ মিলিয়ন টন পলি প্রবাহিত হয়। আর গঙ্গায় প্রবাহিত হয় ৩১৬ মিলিয়ন টন পলি। দুই নদীর (১ হাজার ৩৭ মিলিয়ন টন) পলি মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাওয়ার কথা। কিন্তু মাত্র ৫১ শতাংশ (৫২৫ মিলিয়ন টন) বাংলাদেশের উপকূল এলাকায় যায়। বাকি ৫১২ মিলিয়ন টন নদী দুটির নিম্নাংশে জমা হয়।

এ পলির ২৮ শতাংশ (২৮৯ মিলিয়ন টন) নদীর প্লাবন ভূমিতে জমা হয়। ২১ শতাংশ (২২৩ মিলিয়ন টন) নদীর বুকেই জমা হয়। ফলে প্রতি বছর নদীর তলদেশ ৩ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যদিও ব্রহ্মপুত্র অধিক পলি নিয়ে আসছে।

কিন্তু গঙ্গা ভরাটের হার তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশের গবেষক রেজওয়ানুল ইসলামসহ বাংলাদেশ-জাপানের চারজন ওই স্টাডিটি করেছেন। পরে আরও একাধিক গবেষণায়ও পলিতে নদী ভরাটের প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে।

গবেষণাগুলো বলছে, নদীতে পলি জমাট হওয়ার নানা কারণ আছে। এর মধ্যে আছে, নদীর প্লাবন ভূমি ও জলাভূমি দখল হয়ে যাওয়া। কোথাও বাঁধের কারণে আবার কোথাও জবরদখলের কারণে প্লাবন ও জলাভূমি দখল হয়ে গেছে। বন্যায় দু’কূল ছাপিয়ে পানি গিয়ে এ দুই ভূমিতে থাকে। ফলে পলিমাটি সেখানে জমা হয়।

এখন সব পানিই থাকছে নদীতে। ফলে প্রবাহের সঙ্গে পলি যেতে পারে তা যাচ্ছে, বাকিটা জমাট হচ্ছে। যমুনার পাশাপাশি এবার তিস্তায়ও পানি প্রবাহের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এর পেছনেও নদীর তলদেশ ভরাটের কারণ আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকাল ২ মাসের। বর্ষা হতো ৬০ দিনের বেশির ভাগ দিনেই। আর এখন অল্প সময়ে অনেক বৃষ্টি হয়। সাধারণত ১ দিনে ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে তা স্থানীয় বন্যায় পরিণত হয়। কিন্তু ৩০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি হলে তা ১০ দিনব্যাপী বন্যার কারণ হতে পারে।

সেই হিসাবে গত ৩-৪ বছর ধরে অল্পসময়ে উল্লিখিত (৩০০ মিলিমিটার) পরিমাণের সমান বা কখনও বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ফলে তা শুধু স্বল্পমেয়াদিই নয়, মধ্যমেয়াদি বন্যায় পরিণত হয়েছে।

জলবায়ু ও বন্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার বাংলাদেশ এ সমস্যাটিই মোকাবেলা করছে। কেননা পাহাড়ি নদী সাঙ্গুর তলদেশ পলিতে ভরাটের কথা নয়। কিন্তু এবার সেখানেও সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে পানিস্তর উঁচু হয়েছে। ফলে বান্দরবান ও চট্টগ্রামে বন্যা সৃৃষ্টি হয়েছে।

নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাভূমি ও প্লাবন ভূমিতে পলি যেতে না পারাই শুধু নদী ভরাটের একমাত্র কারণ নয়। তাদের মতে, উজান থেকে আগের তুলনায় পলিপ্রবাহও বেড়েছে। বাংলাদেশের সব নদ-নদী তিনটি অববাহিকাভুক্ত। এগুলো হচ্ছে- গঙ্গা-পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও মেঘনা।

এ তিন অববাহিকা এলাকার পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার বর্গ কিমি., ৫ লাখ ৮৩ হাজার বর্গ কিমি. ও ৬৫ হাজার বর্গ কিমি.। কিন্তু এ অববাহিকা এলাকাগুলোর প্রায় ৮ শতাংশ বাংলাদেশের মধ্যে আছে। বাকি অংশ চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানে বিস্তৃত।

ফলে পলি প্রবাহের মূল কারণ ৯২ শতাংশ এলাকা দেশের বাইরের। উজানের দেশগুলো থেকে কম পলি এলেই তা শুধু ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

অধ্যাপক একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্রহ্মপুত্র (যমুনা), গঙ্গা (পদ্মা) ও তিস্তার উজানে অনেক বাঁধ-ড্যাম আছে। ওইসব এলাকায় ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন হয়েছে। সিমেন্টের জন্য পাথর তোলা হচ্ছে। কোথাও কয়লা খনিতে কাজ চলছে। আবার বৃক্ষ নিধন করে উন্নয়ন কাজ চলছে। চাষাবাদ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবমিলে এখন উজান থেকে পলি আসার হার বেশি।

তিনি বলেন, পলিতে নদী ভরাট বন্ধ করতে হলে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রয়োজনের নিরিখে নদী খনন ও বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। জলাভূমি ও প্লাবন ভূমি নদীকেই ছেড়ে দিতে হবে। ভারতের যেখান থেকে পানি আসে সেখানে নগরায়ণ, কয়লা-পাথর খনন বন্ধ ও বনায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক নদী কমিশন (জেআরসি) আছে। কিন্তু আমাদের প্রধান নদীগুলো অনেক দেশের মধ্যে প্রবাহিত। তাই ভবিষ্যতের বড় বন্যা থেকে বাঁচতে হলে অববাহিকাভিত্তিক বহুপক্ষীয় কমিশন গঠন করতে হবে। নইলে পলি আসতেই থাকবে। পাশাপাশি ভরাট হবে নদী, আর বন্যায় ভাসবে বিস্তীর্ণ এলাকা।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
       
                                             
                           
ফেইসবুকে আমরা