বাংলাদেশ , সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনাভাইরাস: বেসরকারি হাসপাতালেও আইসোলেশন ওয়ার্ড

সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ  ২০২০-০২-১২ ২০:০৫:২৪   

  রাশেদ রাব্বি:

নতুন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি সব বেসরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি সম্পন্ন হলে কয়েক হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত থাকবে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরের পাশাপাশি ভারত থেকে আসা রেল যাত্রীদেরও স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এ সন্দেহে ১০ বাংলাদেশিকে কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে সিঙ্গাপুর সরকার।

দেশটিতে এরআগে আক্রান্ত দু’জনের একজন আইসিইউতে অপরজন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১১৩ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৬৫৩ জনে। নতুন ভাইরাসটির আনুষ্ঠানিক নাম ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এখন থেকে এটি COVID-19 (কভিড-১৯) নামে পরিচিতি পাবে।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি সব বেসরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ইতিমধ্যে দু’দফায় এ ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

অধিদফতরের মহাপরিচালক সব বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন চলছে দ্রুতগতিতে। এ প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে প্রয়োজনে এ সংক্রান্ত কয়েক হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।

নির্দেশনা অনুযায়ী রাজধানীর বড় ও মাঝারি ধরনের হাসপাতালগুলোকে ৫ থেকে ১০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড করতে বলা হয়েছে। যেই ওয়ার্ডটি হবে হাসপাতালের একপাশে। প্রতিটি শয্যার দূরত্ব হবে কমপক্ষে ১ মিটার।

সেখানে যারা সেবা প্রদান করবেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালের অন্য রোগীরা যেন তাদের সংস্পর্শে আসতে না পারে সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

এ ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী আছে কিনা। কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, আমাদের ইতিমধ্যে দু’বার এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে অনেকে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে। কিন্তু সরকারের এ ধরনের নির্দেশনা আমাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। দেশে যদি কোনো রোগী না থাকে তাহলে কেন এ প্রস্তুতি।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, অধিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের দেশে এখনও কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। আশা করছি কোনো রোগী পাওয়া যাবে না। কিন্তু এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব হলে যেন আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেই সক্ষমতা অর্জনেই এ প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

আইইডিসিআরের সংবাদ সম্মেলন : নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে এ সন্দেহে ১০ বাংলাদেশিকে কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে সিঙ্গাপুর সরকার। ইতিমধ্যে আক্রান্ত দু’জন বাংলাদেশির একজন আইসিইউতে অপরজন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দ্বিতীয় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমজনের সংস্পর্শে ছিলেন। এ রোগীদের সংস্পর্শে ছিল ১০ বাংলাদেশিসহ এমন ১৯ জন এখন কোয়ারেন্টাইনে।

সিঙ্গাপুর সরকার তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা নিয়মিত আমাদের দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আর দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করছে।

বুধবার দুপুরে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এসব কথা জানান। করোনাভাইরাস নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. এএসএম আলমগীর।

অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, চীনের পাশাপাশি এখন সিঙ্গাপুরের প্রতি বিশেষ নজর দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেখানে দু’জন বাংলাদেশি শনাক্ত হওয়ায় আমরাও বিশেষ নজর দিচ্ছি।

সিঙ্গাপুরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলাদা করে এখনও নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে না। কারণ সব এয়ারলাইন্সকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটেও বিশেষ নজরদারি হবে। যারা সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আসছেন তাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, তারা যেন বাড়িতে ঘরের মধ্যে সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকেন।

আইইডিসিআরের হটলাইনে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩০টি ফোনকলের মধ্যে নতুন এ ভাইরাস নিয়ে কল এসেছে ১০৭টি। এছাড়া ৫৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছে তিনটি।

তবে এসব নমুনার মধ্যে এখন পর্যন্ত নতুন এ করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আইসোলেশনে কোনো রোগী নেই। ১ ফেব্রুয়ারি চীন থেকে ফেরা হজ ক্যাম্পে অবস্থারত বাংলাদেশিদের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। তারপরে ছাড়পত্র দিয়ে তাদের কিভাবে গন্তব্যে পৌঁছানো হবে সে বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে।

তিনি বলেন, এতদিন স্থল-সমুদ্র ও বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্ক্রিনিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আসা মৈত্রী ট্রেনের যাত্রীরা ছিলেন স্ক্রিনিংয়ের বাইরে। এ ট্রেনটি সপ্তাহে ৪ দিন আসে। যাত্রীরা নামেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে। মঙ্গলবার থেকে এ ট্রেনের যাত্রীদের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে দর্শনা হয়ে খুলনা একটি ট্রেন যায়। সেটিও স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

অধ্যাপক সেব্রিনা বলেন, এতদিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনে এ ভাইরাস নিয়ে ক্লোজলি মনিটর করছিল, এখন এ কার্যক্রমে জাতিসংঘও যুক্ত হয়েছে। তারা একটি টিম গঠন করেছে, যেটা ইউএন ম্যানেজমেন্ট টিম হিসেবে কাজ করবে। যদিও নেতৃতে থাকছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই। এ দলে আরও যোগ হয়েছে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব অ্যানিমেল এবং ফুড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, নতুন এ ভাইরাসের ভ্যাকসিন পেতে এখনও ১৮ মাস সময় লাগবে। তাই আমাদের হাতে প্রতিষেধক আসতে বেশ কিছু সময় প্রয়োজন। তাই একে রুখতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই একমাত্র উপায়।

মৃত্যু ১১১৫ আক্রান্ত ৪৪ হাজার ৬৫৩ : চীনের হুবেই প্রদেশে এ ভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১১৩ জনে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ফিলিপিন্স ও হংকংয়ে দুই চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। চীনে জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার একদিনে এ ভাইরাসে মারা গেছেন ৯৭ জন; তাদের মধ্যে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে হুবেই প্রদেশে।

বুধবার পর্যন্ত নতুন করে ২০১৫ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৬৫৩ জনে। চীনের বাইরে অন্তত ২৫টি দেশে আড়াইশ’র বেশি মানুষের শরীরে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। চীনে এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জয় নানশান বলেছেন, এপ্রিলের দিকে বিপদ পুরোপুরি কেটে যাবে।

রোগের নাম COVID-19 : চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নতুন করোনাভাইরাসটির আনুষ্ঠানিক নাম ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এতদিন এটির নাম ছিল nCov-2019 এখন থেকে এটি COVID-19 নামে পরিচিত হবে।

সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াস মঙ্গলবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এখন থেকে এ রোগ COVID-19 নামেই পরিচিত হবে। এ নামের মধ্যে CO দিয়ে করোনা, ঠও দিয়ে ভাইরাস, উ দিয়ে ডিজিজ (রোগ) বোঝানো হচ্ছে। আর ১৯ থাকছে ভাইরাস ছড়ানোর সময় হিসেবে ২০১৯ সালকে চিহ্নিত করার জন্য।

রংপুর মেডিকেলে চীন ফেরত আরেক শিক্ষার্থী ভর্তি : করোনাভাইরাস সন্দেহে তৌফিক হোসেন নামে চীন ফেরত আরও এক শিক্ষার্থীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রমেক) করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। সে দিনাজপুরের ফুলবাড়ির আবদুল কাদেরের ছেলে।

বুধবার বিকালে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

এ নিয়ে রমেকে করোনা রোগ সন্দেহে ৩ জনকে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে ঢাকায় একজন চিকিৎসাধীন আছেন। অপরজন রমেকে চিকিৎসাধীন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে রমেকের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. নারায়ণ চন্দ্র জানান, ৩ দিন আগে শিক্ষার্থী তৌফিক চীন থেকে দেশে ফিরে বাসায় আসেন। মঙ্গলবার থেকে সে হঠাৎ করে জ্বর, সর্দি ও বুকে ব্যথা অনুভব করে। কিন্তু বুধবার দুপুর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হলে তাকে সরাসরি করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার চিকিৎসা চলছে।

ছেলের শরীরে করোনা শুনেই মায়ের মৃত্যু : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রতন রপ্তান। ভারতে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সোমবার দুপুরে ভারত থকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালি গ্রামে নিজ বাড়িতে ফেরেন।

তবে গায়ে জ্বর, সর্দি ও কাশি থাকায় ভোমরা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশনে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর নেয়া হয় সদর হাসপাতালে। এরই মধ্যে রতনের নিজ এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, পুলিশ রতনকে গুলি করে মেরে ফেলবে। রতনের করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে।

একথা শুনেই রতনের মা রেনুকা রপ্তান (৫৬) রাত পৌনে ১২টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শ্যামনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অজয় সাহা বলেন, করোনাভাইরাস সন্দেহে রতনকে সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। তার শরীরে সে ধরনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সে সেখান থেকে কাউকে কিছু না জানিয়ে পালিয়ে যায়।



ফেইসবুকে আমরা

আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন
অনলাইন বিজ্ঞাপন