বাংলাদেশ, , মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পথশিশু

বাংলাদেশ পেপার ডেস্ক ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০২০-০১-০৩ ০৭:৫৭:১৫  

দেশে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু আছে সাড়ে ১১ লাখ।
পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, মূলত দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা পথশিশুতে পরিণত হচ্ছে। এ ছাড়া বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ বা একাধিক বিয়ে, তাঁদের মৃত্যু, পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, নদীভাঙন, হারিয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুরা পরিণত হয় পথশিশুতে।
সম্প্রতি এ রকমই এক পথশিশু সাফিয়ার দেখা পাই চট্টগ্রামের ডি.সি হিল এলাকায়। বয়স আনুমানিক ১২ বছর। ফুল বিক্রি করছিল সে। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে সে পথে পথে ফুল বিক্রি করছে। সাফিয়ার কাছ থেকে কিছু ফুল কিনি। জিজ্ঞেস করি, কেন ফুল বিক্রি করছ? সাফিয়ার জবাব, ‘এই ফুল বিক্রি কইরা আমার আর ছুডু ভাইয়ের খাওন কিনি।’
‘শুধু ফুল বিক্রি করে খাবারের টাকা জোগাড় হয়?’
সাফিয়ার উত্তর, ‘না ভিক্ষাও করি।’
জানতে চাই তাদের বাবা-মা কোথায় থাকেন। সাফিয়া জানায়, মায়ের হাতে মার খেয়ে তারা দুই ভাইবোন পালিয়ে চট্টগ্রাম চলে এসেছে।
বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে সাফিয়ার উত্তর, ‘কেমতে যামু? বাড়ির রাস্তা তো চিনি না।’
সাফিয়ার মতো প্রতিটি পথশিশুর পথে নামার পেছনে কারণ রয়েছে। কিন্তু কারণগুলো দূর করার চেষ্টা করিনি কেউই।
সাফিয়া শুধু একটা নাম না, পথ শিশু র ই একটা প্রতিবিম্ব!
এছাড়াও চট্টগ্রামের সি আর বি এলাকায় মুন্না নামের এক পথশিশুর সাথে কথা বলে জানা যায় সে চটপটির দোকানে কাজ সহ যে কাজ পায় তাই করে, ষোলশহর রেল ষ্টেশনের বেড়ে ওঠা শিশু ইসরাত ফেরি করে বেড়ায়,চট্টগ্রাম বটতলী ষ্টেশনের ইলিয়াস কাগজ কুড়িয়ে বেড়ায়।
তাদের প্রতিটি জীবন নানা গল্পে ও চরিত্রে ভরপুর, যে বয়সে মায়ের কোলে পরিবারে সাথে থাকার কথা সে বয়সে তারা ফুটপাত আর পথকেই তাদের শেষ আশ্রয়স্থল বেছে নিয়েছে।
প্রতিবছর ২ অক্টোবর আমাদের দেশে পালিত হয় ‘জাতীয় পথশিশু দিবস’। দিনটি পালন উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু যাঁরা এসব কর্মসূচি পালন করেন, তাঁরা কি একবারও ভাবেন, কেন আমরা দিবসটি পালন করছি? এই দিবস পালনের মধ্যে যে আমাদের লজ্জাও লুকিয়ে আছে। শিশুদের এ অবস্থার জন্য দায়ী তো আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোই। তাহলে আমরা কেন দিবসটি পালন করছি? আর এ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে তো পথশিশুদের আসলে কোনো লাভ হয় না।
আমাদের দেশে অনেকে পথশিশুদের জন্য অনেক কিছু করেন। কেউ ঈদের সময় নতুন পোশাক কিনে দেন, কেউ পিঠা উৎসবের, আবার কেউ খেলাধুলার আয়োজন করেন, কেউ কেউ পথশিশুদের জন্য স্কুল খুলে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু এসব পদক্ষেপ পথশিশুদের দীর্ঘ মেয়াদে কোনো উপকার করে না। যথাযথভাবে পুনর্বাসন না হওয়ায় তারা আবার আগের জীবনেই ফিরে যায়।
উন্নত দেশগুলোয় দেখা যায়, প্রত্যেক শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রযন্ত্র এদের সম্বন্ধে অসচেতন। ফুটপাত, পার্ক, ট্রেন ও বাসস্টেশন, লঞ্চঘাট, সরকারি ভবনের নিচে বসবাসকারী এসব পথশিশুকে দেখার কেউ নেই। অবহেলা, অনাদরে, খেয়ে না–খেয়ে তাদের দিন কাটে। তারা মাদকাসক্ত হচ্ছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিশু সনদ, শিশু আইনসহ দেশের প্রচলিত আইনে প্রতিটি শিশু তাদের সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশ লাভের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, খাদ্য ও পুষ্টি, বিনোদন পাওয়ার অধিকার রাখে। শিশুদের সব ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে এসব সনদ ও আইনে । কিন্তু আমাদের দেশের পথশিশুরা এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত।
সরকারকে এখন এসব পথশিশুর কথা নতুন করে ভাবতে হবে। শিশুরা যাতে আর পথে বসবাস না করে, তার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। সে জন্য প্রথমে যা করতে হবে, তা হচ্ছে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করা। যদিও এখন বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৩১৬ ডলার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। মাথাপিছু জিডিপি কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। কিন্তু দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য হ্রাসে এখনো তেমন সাফল্য অর্জিত হয়নি। ফলে দরিদ্র মানুষ দরিদ্রই রয়ে গেছে। দেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে শিশুদের পথে জীবন যাপন করা থামানো যাবে না। এর জন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়াতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। সন্তানকে ভালোবাসতে হবে। তাদের সুশিক্ষা দিতে হবে। শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় তার পরিবার। কিন্তু সেই পরিবারে যদি সে অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে সেখানে সে থাকতে চাইবে না। মা-বাবা বা অভিভাবকের হাতে মার খেয়ে সন্তান বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে—আমাদের দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি। কাজেই পরিবারকে হতে হবে শান্তিপূর্ণ। এর জন্য সমাজ থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে হবে। সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। জানি অনেকেই বলবেন যে বলা সহজ, করা কঠিন। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই করতে হবে সবাই মিলে। আসুন, এমন একটি দেশ গড়ি, যেখানে ‘পথশিশু’ বলে কেউ থাকবে না।

আকাশ,কামরুল,ঐন্দ্রিলা,
মোঃইসহাক,মুশফিক,সুস্মিতা।
আইন বিভাগ,৩৮ তম ব্যাচ।
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম।


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
       
                                             
                           
ফেইসবুকে আমরা