বাংলাদেশ, , মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪

ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের নিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গা অপরাধী সিন্ডিকেট

বাংলাদেশ পেপার ডেস্ক ।।  সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ ২০২২-১০-২৯ ২৩:৩৭:২৫  

শফিউল্লাহ শফি, কক্সবাজারঃ

কক্সবাজারে এক ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা অপরাধী সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ সিন্ডিকেট নিয়ে সম্প্রতি সময়ে কক্সবাজার শহরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা অপকর্মকারী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগের ইন্সপেক্টর (টিআই) আমিনুর রহমান। তার প্রধান সহযোগী রোহিঙ্গা যুবক মনসুর, আব্দুছ সালাম ও সেলিম। এ চারজনের সিন্ডিকেটে চলছে মাদক চোরাকারবার, নারী ও মদ নিয়ে জলসার আয়োজন, উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীদের চাকরি দেওয়ার নামে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, টার্গেট করে নানা যানবাহন ও পরিবহণ আটকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় বাণিজ্য। সিন্ডিকেটের ৭টি যানবাহনে পুলিশের স্টিকার ও লোগো লাগিয়ে নিরাপদে ইয়াবা পাচারের খবরও রয়েছে।

সূত্র জানায়, মনসুরের বাড়ি মিয়ানমারের বুচিদং। তার বাবা জাফর আমির হোছন ও মা দলু বিবি অনেকদিন আগে অবৈধভাবে এদেশে ডুকে টেকনাফের নতুন পল্লানপাড়ায় আশ্রয় নেয়। কৌশলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ে সপরিবারে দুবাই পাড়ি জমায়। জাফরের দুই ছেলে মনসুর ও ওমর। মাদক সেবন করে কলেজছাত্রী অপহরণের ঘটনায় দুবাইয়ে মনসুরের তিন বছর এবং ওমরের ২ বছর সাজা হয়। সাজা শেষে সেই দেশের সরকার তাদের ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। দেশে ঢুকে প্রথমে টেকনাফ, পরে কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ হাজীপাড়ায় বসবাস শুরু করে। ওই বছরই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় সেই দেশের সেনাবাহিনী। যে কারণে একসঙ্গে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা এ দেশে প্রবেশ করে। আর তাদের নিয়ে মানবতার কাজ শুরু করে দেশি-বিদেশি এনজিও সংস্থা। চাকরি হয় অসংখ্য বেকার যুবক-যুবতীর। ওই সময় মিয়ানমার, ইংরেজি ও আরবি ভাষা জানার সুবাধে হেলভেটাস নামের একটি এনজিওতে চাকরি পায় মনসুর। কয়েক মাস চাকরি করতে না করতে মনসুরের হাতে এসে ধরা দেয় ইয়াবা নামের আলাদিনের চেরাগ। অল্প সময়েই মরণনেশা ইয়াবার ব্যবসা করে রাতারাতি কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে যায়। কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউপির দক্ষিণ হাজীপাড়ার ঠিকানায় বানিয়ে নেয় মনসুর ও ওমর দুই ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং কিনে নেয় ৫৫ লাখ টাকায় রেডি করা দোতলাবিশিষ্ট বাড়ি। অবৈধ আয়ের উৎস থেকে মালিক বনে যায় পাজেরো গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ জেলগেট এলাকায় কয়েকটি দোকানের। তবে মনসুর ও তার ভাই ওমরের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও তার বাবা-মা ও দাদার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই।

 

সূত্র জানায়, মনসুরের সঙ্গে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আমিনুর রহমানের পরিচয় হয় মনসুরের অবৈধ ও কাগজপত্রবিহীন পাজেরো গাড়ি আটকের ঘটনায়। এক বছর আগে কলাতলীতে মনসুরের গাড়ি আটক করে টিআই আমিন। পরে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয়। এক পর্যায়ে টিআইয়ের সঙ্গে কথা বলে সুচতুর মনসুর দাওয়াত দিয়ে মদ, নারীসহ জলসাতে নিয়ে যায় ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আমিনকে। তখন থেকেই দুজনের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত হয়। মনসুরের মাদক ব্যবসা থেকে এক বছরে ৫টি গাড়ির মালিক বনে যায় টিআই আমিন। ১টি মোটরসাইকেল, ১টি নোয়া, ১টি পাজেরো, ১টি ল্যান্ডক্রুজার ও একটি জিপ। বর্তমানে সবকটি গাড়ি পুলিশের লোগো ও স্টিকার লাগিয়ে চালাচ্ছে মনসুর, আব্দুছ সালাম ও সেলিম। নিরাপদে চালাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম।

সিন্ডিকেটের সহযোগী মিয়ানমার নাগরিক সেলিম বলেন, এখন আমি তাদের সঙ্গে নেই। আমি উপজেলায় একটা দোকান করতাম। তারা রাতের বেলায় মদ ও নারী নিয়ে আমার দোকানে আসর বসানোর কারণে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। দোকানও নিয়ে গেছে মালিক। তাই দয়া করে তাদের অপকর্মে আমাকে জড়াবেন না। মনসুর বলেন, আমি রোহিঙ্গা নই। আমার বাড়ি প্রথমে টেকনাফ, পরে শহরের বাদশাঘোনা, তারপর পিটিস্কুল, বর্তমানে উপজেলার হাজীপাড়ায়। আমার বাপ-দাদা ও মাসহ সবাই বিদেশ থাকার কারণে কেউ ভোটার হতে পারেনি। আমরা দুই ভাই হয়েছি।

 

 

মনসুর আরও বলেন, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আমিনের সঙ্গে আমার গাড়ি আটকের ঘটনা নিয়ে সম্পর্ক হয়েছে তা সত্য। তার ৫-৬টি গাড়ি পড়ে আছে। সেগুলো নানা কাজেকর্মে তার অনুমতিতে চালাই। পুলিশের গাড়িতে পুলিশের স্টিকার লাগানো আছে, সেখানে আমার করার কিছুই নেই। এই গাড়ি করে ইয়াবা পাচারের বিষয় সত্য নয়। তবে মাঝে মধ্যে এনজিওতে কর্মরত সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধব চলাচল করে।

ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, ৪-৫ মাস আগে টিআই আমিনের বিরুদ্ধে মাদকসেবন, নারীদের নিয়ে জলসা, রোডে যানবাহন ও পরিবহণ ধরে ধান্ধাবাজির কারণে সাবেক পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান তাকে আড়াই মাস ক্লোজ করে অফিসে বসিয়ে রেখেছিল। অনেক কাকুতিমিনতির পর আবার ডিউটি পায় এই টিআই।

 

 

নানা অভিযোগের ব্যাপারে কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগের ইন্সপেক্টর (টিআই) আমিনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমাকে ক্লোজ করে অফিসে বসিয়ে রাখা পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। মনসুরের সঙ্গে আমার গাড়ি আটকের ঘটনায় সম্পর্ক, তা ঠিক। তবে অবৈধ কোনো কিছু করি না। সারাদিন কাজ শেষে রাতে একটু আড্ডা দিই। আরও বলেন, আমার ৫টি গাড়ি আছে। এসব বিক্রি করার জন্য কিনেছি। পড়ে আছে বিধায় মনসুরসহ কয়েকজন চালায়। গাড়িতে পুলিশের লোগো ও স্টিকার ছিল, সব খুলে ফেলেছি। মনসুরসহ তারা কয়েকজন আমার গাড়ি চালাচ্ছে বেশিদিন হয়নি, ৪-৫ মাস হবে।

কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, তার বিষয় নিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তার সবকিছু এই শহরের সবাই জানে। একটা মানুষের ভালো খারাপের সাইট কয়টা থাকে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। দয়া করে আপনি সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে কথা বলেন বলে এ প্রতিবেদককে অনুরোধ জানান।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের লোগো বা স্টিকার লাগিয়ে সাধারণ লোকজন গাড়ি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। করে থাকলে এটি আইনত অপরাধ। টিআই হিসেবে তার ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে পুলিশের স্টিকার লাগিয়ে ব্যবহার করতে পারে। আমি এখনই খোঁজখবর নিচ্ছি। যদি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্রঃ যুগান্তর


পূর্ববর্তী - পরবর্তী সংবাদ
       
                                             
                           
ফেইসবুকে আমরা