দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে সমৃদ্ধ করা এক মসজিদ

প্রকাশিত: ১১:৪৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২২

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, এদিক দিয়ে বাংলাদেশ বেশ সমৃদ্ধ। এমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা দেশের সর্ব উত্তরের প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর শাহী মসজিদ। এটি মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত জেলার একমাত্র প্রাচীন মসজিদ। এই মসজিদটি সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পের একটি অন্যতম উপাদান। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে এই মসজিদ।

প্রায় ছয়’শ বছর আগে নির্মিত হলেও কালের সাক্ষী হয়ে এখনও তার জৌলুস ধরে রেখেছে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় অবস্থিত এই তিন গম্বুজ বিশিষ্ট শাহী মসজিদ। মসজিদের দেয়ালের প্রাচীন টেরাকোটা ও খোদাই করা দৃষ্টিনন্দন নক্সা মসজিদটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শাহী মসজিদের নির্মাণ শৈলীর সঙ্গে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদের অনেকটাই সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এটির দেয়ালের টেরাকোটা আর সুনিপুণ কারুকাজ দেখতে প্রতিদিনই আসেন দেশী- বিদেশী পর্যটকরা।

ঐতিহাসিকদের অভিমত, মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় মির্জাপুর শাহী মসজিদ। কারও কারও ধারণা, মির্জাপুর গ্রামের মালিক উদ্দিন এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কেউ কেউ মনে করেন, দোস্ত মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। তবে মসজিদের শিলালিপি ঘেঁটে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন, ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসক শাহ সুজার শাসনামলে এটি গড়ে তোলা হয়।

মসজিদের সামনে আয়তকার টেরাকোটার কারুকার্যগুলো একটির সঙ্গে আরেকটির মিল নেই। মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুট। একই সারিতে আছে ৩টি গম্বুজ। এর চারকোণায় আছে ৪টি মিনার। সামনে আছে ৩টি দরজা।

সদর দরজা ও মাঝখানের গম্বুজের সামনের দিকে দু’পাশে আছে ২টি ছোট মিনার। মসজিদের ভেতরের অংশে খোদাই করা আছে ফুল, লতা-পাতা ও কুরআনের আয়াত সংবলিত ক্যালিগ্রাফি। এসব খোদাই করা কারুকার্য বিভিন্ন রঙে সাজানো।

মসজিদের মধ্যবর্তী দরজার ওপরিভাগে পারস্য ভাষায় লেখা অস্পষ্ট একটি ফলক অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে, মোগল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে এই মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এছাড়া মোগল স্থাপত্যরীতি ও বৈশিষ্ট্যে নির্মিত এ মসজিদের গম্বুজের শীর্ষবিন্দু ক্রমহ্রাসমান বেল্ট দ্বারা যুক্ত। ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের এ মসজিদের ভেতরে দুটি কাতার বা দুই লাইনে বসার সুযোগ রয়েছে। যাতে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে থাকেন।

দেয়ালে ব্যবহৃত পাতলা প্রতিটি ইটে বিশেষ নক্সায় পরিপূর্ণ। নান্দনিক কারুকাজ আর প্রাচীনকালের এক রহস্যময় আলেখ্য এ মসজিদটি। হারানো দিনের সমৃদ্ধ ইতিহাস খুঁজতে এখন গবেষণা করছেন দেশী-বিদেশী গবেষকরা। মসজিদটিকে জেলার পর্যটন শিল্পের অন্যতম উপাদান হিসেবে মনে করা হয়।

স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, বহু বছর আগে ভূমিকম্পে মসজিদটির বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এ গ্রামেরই তৎকালীন মালিক উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ইরান থেকে কারিগর এনে মসজিদটির সংস্কার কাজ করেন। বর্তমানে আটোয়ারী উপজেলা প্রশাসন মসজিদটির তত্ত্বাবধান করছে। মসজিদের পূর্বপাশে রয়েছে ইমামবাড়া বা হোসেনি দালান।

ইটের তৈরি ইমামবাড়ার ভেতরটা গোলাকার এবং একটি কক্ষ রয়েছে। ইমামবাড়ার ভেতরের কক্ষে এক সময় মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতো।

বর্তমানে মসজিদটির দেওয়ালে ও গম্বুজে কিছুটা ফাটল ধরেছে। এছাড়া ভেতরের বিভিন্ন জায়গায় পলেস্তারাও অল্প অল্প খসে পড়েছে।

মির্জাপুর শাহী মসজিদের নিপুন কারুকার্য, সোন্দর্য্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভ্রমণপিপাসুদের মনের তৃষ্ণা মেটায়। তবে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির তত্ত্বাবধায়নে এলাকাবাসীর পাশাপাশি সরকারের দৃষ্টিপাত জরুরি।

যে ভাবে যাবেন- ঢাকা থেকে প্রথমে বাসে সরাসরি পঞ্চগড় অথবা আটোয়ারী উপজেলা বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে। আটোয়ারী থেকে বাসযোগে মির্জাপুর ৬ কিলোমিটার। মির্জাপুর থেকে পূর্ব দিকে রিকশা/ভ্যানযোগে ১ কিলোমিটার গেলেই মির্জাপুর শাহী মসজিদ। এছাড়া চাইলে ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সরাসরি পঞ্চগড় স্টেশন। এরপর পঞ্চগড় স্টেশন থেকে বাস যোগে আটোয়ারী। আটোয়ারী থেকে ইজিবাইক অথবা ভ্যান যোগে ৪ কিলোমিটার পূর্বেই মির্জাপুর শাহী মসজিদ।