আমাদের জুডিশিয়ারি সিস্টেম ও হিউম্যান রাইটস

প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০২২

রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। আইনের শাসনের অর্থ হচ্ছে সব নাগরিকের প্রতি আইনের সমান দৃষ্টি অর্থাৎ আইন সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। দেশে সব স্তরে আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব। নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকার কেবল আইনের শাসনের মাধ্যমে বলবৎ

করা যায়। আইনের শাসন না থাকলে সবল-দুর্বল, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকট হতে থাকে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার বেড়ে যায়। মানুষের মধ্যে মায়া, মমতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, নীতি-আদর্শ লোপ পায়।

 

কিন্তু আইনের শাসনের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনও সমর্তন যোগ্য নয়। একজন অপরাধী দেশের প্রচলিত আইনে যখন অপরাধ সংগঠিত করে, তখন দেশের বিচারবিভাগ সেই ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়। আমাদের পেনাল কোড, ফৌজদারি কার্যবিধি, থেকে শুরু করে অনেক আইন ব্রিটিশ আমলের। যেখানে ব্রিটিশরা এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অসহায় প্রজাদের জুলুম করতো। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ব্রিটিশ শোষিত এই আইনের মাধ্যমে মানুষ কতোটা সুফল পাচ্ছে সেটা আজ আমাদের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেখার বিষয়।

 

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কেইস রেফারেন্স পড়তে গিয়ে চোখে পড়লো জিআর কেইস নং-৮৬/ ২০০২, নারী ও শিশু মামলা নং-৩৩৭/২০০২, ধারা- ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ (ক)। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবদুল হক তাঁর স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করেন। ঘটনার পরের দিন ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর শ্বশুর বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ২০০৭ সালের ৩ মে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আবদুল হকের পরিবার হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও সেখানে সাজা বহাল থাকে। সর্বশেষ আবদুল হক রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। তবে আবেদনটি মঞ্জুর হয়নি। এর পর গত ১০জুন ২০২১ তারিখে দীর্ঘ ১৯ বছর পরে আবদুল হকের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে দিনাজপুর জেলা কারাগারে।

 

একজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আপীল,রিভিউ, রিভিশনে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। সেখান থেকে আসামির মুক্তি না মিললে  আসামিকে ১২-২০ বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। এর চেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর হতে পারে না। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, সংবিধান ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে মনে করি। আবদুল হক নামের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামির প্রায় তিন দশক কেটে গেলো কনডেম সেলে। যেখানে তার মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার দুটাই ভায়োলেশন করা হয়েছে।

 

যেখানে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮ এর ধারা- ৫,৬,৭,৮,৯ এ বলা আছে, কাউকে নির্যাতন করা যাবে না; কিংবা কারো প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না অথবা কাউকে এহেন শাস্তি দেওয়া যাবে না যেখানে কোনো ব্যক্তি তার মৌলিক ও মানবাধিকার  অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আরো বলা হয় যে,আইনের সামনে প্রত্যেকেরই ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার আছে। আইনের চোখে সবাই সমান এবং ব্যক্তিনির্বিশেষে সকলেই আইনের আশ্রয় সমানভাবে ভোগ করবে। এই ঘোষণা লঙ্ঘন করে এমন কোন বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না যেখানে একজন নাগরিক সমান ভাবে আশ্রয় লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

 

শাসনতন্ত্রে বা আইনে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত জাতীয় বিচার আদালতের কাছ থেকে কার্যকর প্রতিকার লাভের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে এবং কাউকেই খেয়ালখুশীমত গ্রেপ্তার বা অন্তরীণ করা কিংবা নির্বাসন দেওয়া যাবে না। কিন্তু আবদুল হকের প্রতি বাংলাদেশের বিচার বিভাগ যে আচরণটি করেছে সেটা মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮ এর বিরুদ্ধে। একটা দেশের বিচার ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যেখানে কোনো প্রকার মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়।তাই আমি মনে করি দ্রুত সময়ের মধ্যে যেকোনো বিচারের রায় কার্যকর করা উচিত।

 

অপরদিকে মৃত্যুদণ্ড বাঁচার অধিকার লঙ্ঘন করে এবং এটি একটি ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অমর্যাদাকর’ শাস্তি৷ যে শাস্তি ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশরা প্রজাদের জুলুম করার জন্য পাশ করছিলো দন্ডবিধির মাধ্যমে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ফাঁসির আদেশ ও কনডেম সেল নামের কবরে মানুষকে রেখে ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ফাঁসির দণ্ড এবং কনডেম সেল এক ভয়ংকর বিচার ব্যবস্থা, এ ক্ষেত্রে কী ভাবে সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হচ্ছে, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সেই ব্যক্তির মানসিক কষ্টের কথাও অসহনীয়। অনেক দেশের শাসকগোষ্ঠী মূলত জনগণকে ভয় দেখাতে, প্রতিশোধ নিতে, দুর্নীতিগ্রস্তদের শিক্ষা দিতে এবং প্রতিপক্ষকে নীরব করতে মৃত্যুদণ্ডের অপব্যবহার করে৷ ১৯৩৩-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি জার্মানিতেও মৃত্যুদণ্ডকে এভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখন সেই জার্মানিতেই মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ, কারণ মৃত্যুদণ্ড একজন মানুষকে তার ভুল শুধরানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।

 

যে দেশগুলি মৃত্যুদণ্ডকে শাস্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে, তারা হলো চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও সৌদি আরব৷ এর মধ্যে কোনো দেশেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নেই৷ কিন্তু বাংলাদেশ একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও দেশের বিচার বিভাগ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের দিকেই ছুটে চলে, এবং সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে একজন অপরাধী যুবক থেকে বৃদ্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগেই মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামিকে কবর জীবনে রাখা হচ্ছে (কনডেম সেল) দীর্ঘদিন ধরে, যেটার মাধ্যমে  ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বিচার বিভাগ।

 

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে কারাগারের মধ্যে অপরাধীর

চিত্তশুদ্ধিরও কোনো সুযোগ থাকে না৷ অনেক ক্ষেত্রে বন্দিরা অনুতপ্ত হয়ে তাদের অপরাধ স্বীকার করে৷ অনেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলে এবং অপরাধের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করে৷ কেউ আরও শিক্ষা গ্রহণ করে, বই লেখে, ধর্মের আশ্রয় নেয়৷ নানা পথে তারা তাদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করে৷ মৃত্যুদণ্ডের সপক্ষে যে যুক্তি সবচেয়ে জোরালোভাবে পেশ করা হয়, তা হলো এর ফলে নাকি অপরাধীরা ভয় পেয়ে যায়৷ কিন্তু এটা বার বার প্রমাণিত হয়েছে, যে মৃত্যুদণ্ড সত্ত্বেও হত্যা, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ, চোরাচালান বা অন্য কোনো অপরাধ বন্ধ হয় নি৷ উলটো অপরাধ ঘটার পর মৃত্যুদণ্ড সমঝোতা অথবা অপরাধীর পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ দেয় না৷ যারা অপরাধের শিকার হয়, তাদের পরিবারের লোকজনের প্রতিশোধ স্পৃহা হয়তো কিছুটা শান্ত হয়৷ কিন্তু অপরাধের প্রবনতা ঠিকই রয়ে যায়।

 

‘‘মৃত্যুদণ্ড যে কোনো অপরাধের শাস্তি হতে পারে না তা আজ সারা বিশ্বে প্রমাণিত হচ্ছে৷ তাই বিশ্বে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বর্জনকারী দেশের সংখ্যা বাড়ছে৷ তাই আমি আশা করি বাংলাদেশেও একদিন মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকবে না এবং মৃত্যুদণ্ডের আদেশের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে অপরাধীকে কনডেম সেল নামক কবর স্থানে বন্ধী রেখে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘন করা থেকে বাহির হয়ে আসবে।

 

কায়সারুল হাসান রুবেল

শিক্ষার্থী আইন অনুষদ

কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি