নিত্যনতুন প্রতারণার ফাঁদ লোভে পড়লেই সর্বনাশ

প্রকাশিত: ১২:০৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২১

দেশে সক্রিয় নানা প্রতারক চক্র। সঙ্ঘবদ্ধ এসব চক্র নিত্যনতুন কৌশলে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন মানুষ। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতারক চক্রের হাত থেকে রেহাই পেতে সচেতনতার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে লোভে পড়লেই ঘটবে সর্বনাশ।

জানা গেছে, প্রতারক চক্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারী সদস্যও রয়েছেন। কোনো কোনো চক্রে আছেন বিদেশিরাও। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র বিস্তৃত এদের প্রতারণার জাল। প্রতারণার শিকার কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হচ্ছেন। আবার কেউ লোকলজ্জা, কেউ বাড়তি ঝামেলার ভয়ে নীরব থেকে যাচ্ছেন।

চাকরি দেয়া, বিদেশ পাঠানো ও বিয়ের নামে প্রতারণা করা হচ্ছে। এছাড়া কনসালটেন্সি ফার্ম খুলে, ব্যাংক লোন করিয়ে দেয়ার নামে, জাতীয় পরিচয়পত্র নকল করে এবং কয়েন, তক্ষকসহ নানা অভিনব জিনিস নিয়ে প্রতারণার বাণিজ্য চলছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়সহ নানা পরিচয় ব্যবহার হচ্ছে।

২ মার্চ রাতে রাজধানীর রামপুরা ও খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি অভিনব প্রতারক চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। এরা জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার থেকে বিভিন্ন লোকের এনআইডির ছবি পরিবর্তন করে ওই এনআইডি দিয়ে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ তুলে লাপাত্তা হয়ে যেত। ঋণ নেয়ার কাজে ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স, ভুয়া টিআইএনও ব্যবহার করত চক্রটি। এভাবে এরা ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও থানা পুলিশ গ্রেফতার করে জাহিদুর রহমান ইকবাল নামের এক প্রতারককে। সে নিজেকে ‘বনবন্ধু’ নামে পরিচয় দিত। রাজধানীর কাওরানবাজার এলাকায় ভুয়া কোম্পানির অফিস খুলে চালিয়ে যাচ্ছিল প্রতারণা। গাড়িতে বঙ্গবন্ধুর বড় বড় ছবি লাগিয়ে ঘুরে বেড়াত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে গাছ লাগানোর কথা বলে প্রায় ৪০ হাজার প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়েছিল সে। প্রতারণার কাজে সে মুজিববর্ষের লোগো ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী ব্যবহার করে।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, শুধু গাছ লাগানোর কথা বলে নয়, সে ভুয়া কনসালটেন্সি ফার্ম খুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিককে ব্যাংক ঋণ করিয়ে দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। জাহিদুর রহমান ইকবাল ওরফে ‘বনবন্ধু’ গত ৩০ বছর ধরে কাওরানবাজার এলাকায় প্রতারণা করে আসছিল। এ ধরনের প্রতারকদের বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

২৩ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতারক চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এরা রিয়েল এস্টেট ব্যবসার আড়ালে ২৪ মাসে দ্বিগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ চক্র বিভিন্ন স্থানে অফিস খুলে বসে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন দিত। এরপর অফিস পরিবর্তন করে আবার নতুন নামে প্রতারণা চালাত। এভাবে তারা ৫ শতাধিক লোককে সর্বস্বান্ত করেছে। এদের টার্গেটের শিকার হয়েছেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি খিলক্ষেত নিকুঞ্জ-২ এলাকা থেকে জহিরুল আলম, রবিউল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম ও উত্তম তালুকদার নামে ৪ প্রতারককে গ্রেফতার করে সিআইডি। তারা চাকরি এবং বিদেশে পাঠানোর নামে চাকরি প্রার্থী লোকজনের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সিআইডি জানিয়েছে, জহিরুল ইসলাম নিজেকে সেনাবাহিনীর মেজর পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করত। এর আগে নাসির নামে এক প্রতারককে গ্রেফতার করে পুলিশ। সে এসএসএফ কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করত। বগুড়ার এক মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। বিয়ের কথাও ছিল প্রায় পাকাপাকি। এ অবস্থায় মেয়ের বাবা খোঁজ নিতে এসে বুঝতে পারেন সে প্রতারক। পরে পুলিশ তাকে গণভবন এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।

সম্প্রতি আরেক প্রতারককে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তার নাম আশরাফুল আলম দিপু। লেখাপড়ায় মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরোলেও ২০ বছর বয়সী এ যুবক নিজেকে কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক, দুদকের পরিচালক, পুলিশের ডিআইজিসহ একেক সময় একেক পরিচয় দিত। নিজ জেলা ভোলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করত দিপু।

বিভিন্ন জেলা সফরে গিয়ে ভুয়া জিও লেটারে নিত পুলিশ প্রটোকল। এমনকি ডায়াসে দাঁড়িয়ে স্যালুট নেয়া থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে বিচার প্রশাসনে প্রভাব খাটাত সে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর তার অজস্র প্রতারণার গল্পে চমকে উঠেছেন খোদ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাই। সে প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে হাতিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সম্প্রতি আরেকটি প্রতারক চক্রের সন্ধান পায়। এর ৬ সদস্য আক্তারুজ্জামান, সালাম, মনিরুজ্জামান কামরুল ওরফে জামান, আবু তাহের জবা ও শফিকুল ইসলাম স্বপনকে গ্রেফতার করা হয়।

পিবিআই সূত্র জানায়, দুর্লভ নাসার কয়েন কিনে আবার বিক্রি করলেই কোটি টাকা লাভ। এ লোভে এই চক্রের হাতে সম্প্রতি শিল্পপতি থেকে শুরু করে সরকারি আমলারাও খুইয়েছেন কোটি কোটি টাকা। একটি কাঠের তৈরি কয়েনকে নাসার কয়েন বলে প্রলোভন দেখাত চক্রটি। বলত, গবেষণার কাজে কয়েনটি নাসায় ব্যবহৃত হয়। এটি কিনে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা যাবে। যার ক্রয়মূল্য ১০ কোটি টাকা। মার্কিন মুলুকে কয়েনটির ব্যাপক চাহিদা। পিবিআই জানায়, এ নাসার কয়েন চক্রের খপ্পরে পড়ে সম্প্রতি সরকারের প্রথম শ্রেণির একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার পেনশনের ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা খুইয়েছেন। আরেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খুইয়েছেন ৮৪ লাখ টাকা। স্বনামধন্য এক ব্যবসায়ী ২ কোটি টাকা হারিয়েছেন।

গত বছর এমন আরেকটি চক্রের সন্ধান পায় র‌্যাব। চক্রের সদস্যরা ধানের ভেতর ভাঙা সুই ভরে সেগুলো আকর্ষণ করাত ম্যাগনেটিক কয়েনে। পরে বিশেষ রাসায়নিকে পাউডার বানিয়ে দেখাত ধানগুলোকে। এভাবে বিভিন্ন কৌশলে কখনও ম্যাগনেটিক কয়েন, পিলার এমনকি তক্ষক নামের প্রাণী বিক্রিরও প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের ধোঁকা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিত প্রতারক চক্রের প্রধান নুরুল ইসলাম ও তার ১৪ সহযোগী।

গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কশিনার মাহবুব আলম বলেন, প্রতারকরা খুবই চতুর। এরা নানা কৌশলে ফাঁদে ফেলতে চায়। এদের খপ্পর থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হলে সব সময় সচেতন থাকতে হবে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন প্রতারকদের পাকড়াও করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। তেমনি প্রতারক চক্রও দিন দিন অভিনব কৌশল বের করে প্রতারণার চেষ্টা করছে। তাই প্রতারক চক্র থেকে দূরে থাকতে হলে লোভকে বর্জন করতে হবে। এ বিষয়ে একটু সচেতন থাকলেই ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান ‘বাংলাদেশ পেপার’কে বলেন, দেশে বহুমাত্রিক প্রতারণা দেখা যাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এজন্য দায়ী উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতারণাবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। তবেই এর সুফল মিলবে।




error: কপি রাইট আইনে সর্বস্বত সংক্ষিত